অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও ছেলেকে হারিয়ে আজিজ বললেন, ‘আমার কেউ রইল না’

অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও ছেলেকে হারিয়ে আজিজ বললেন, ‘আমার কেউ রইল না’

📁 বাংলাদেশ

টিনের ছাউনি; ঘরের বেড়াও টিনের তৈরি। ভেতর থেকে বের হলেন আবদুল আজিজ। চোখে ক্লান্তির ছাপ; হাঁটছেন আস্তে আস্তে। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর তিনি একটু থমকে গেলেন। তাঁর চোখ বেয়ে পানি ঝরছে। এক মিনিট পর বললেন, ‘জানেন ভাই, আমার স্ত্রী ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিল। একমাত্র ছেলের বয়স ৬ বছর। স্ত্রী-সন্তান সবাই চলে গেল। আমার কেউ রইল না।’

আবদুল আজিজের বাড়ি রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মহেন্দ্রপুর গ্রামে। রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে পদ্মা নদীতে বাস ডুবে তাঁর স্ত্রী নাজমিরা ওরফে জেসমিন (৩০) ও ছেলে আবদুর রহমান (৬) নিহত হয়েছেন।

গতকাল বুধবার বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে গোয়ালন্দে দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ঘাটে ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসা বাসটিতে ৪৫ জনের মতো যাত্রী ছিলেন। এ ঘটনায় আজ বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

আজ দুপুরে গ্রামের গোরস্থানে স্ত্রী ও ছেলেকে দাফন করেন আবদুল আজিজ। বাড়ির সামনে বসে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। ঈদের ছুটিতে বাড়িতে পরিবার নিয়ে এসেছিলেন। বুধবার বেলা তিনটার দিকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন তাঁরা। সাভারে একটি গার্মেন্টসে চাকরি করেন তিনি। স্ত্রী-সন্তান ছাড়াও সঙ্গে ছিলেন স্ত্রীর এক স্বজন।

আবদুল আজিজ বললেন, ফেরিতে ওঠার জন্য তাঁদের বাসটি সড়ক থেকে ফেরির পন্টুনের ঢালের সড়কে নেমে দাঁড়িয়ে ছিল। বাসের ‘এ’ ও ‘বি’ লাইনে আসন ছিল। দুর্ঘটনার আগে বাসের চালক ফোনে রাগান্বিতভাবে কার সঙ্গে যেন কথা বললেন। কেন তাঁকে এই ফেরিঘাটে দেওয়া হলো—এ নিয়ে উচ্চ স্বরে কথা বলছিলেন। এর পরপরই বাসে একটা জোরে ঝাঁকুনি লাগে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বাসটি তীব্র গতিতে সামনের দিকে চলতে থাকে। একপর্যায়ে পানিতে গিয়ে অর্ধেক পড়ে। তিন-চার সেকেন্ডের মধ্যে বাসটি তলিয়ে যায়। ছেলে ছিটকে পড়ে। এ সময় সামনের সিটে থাকা স্ত্রীর হাতটা শক্ত করে ধরেন। কিন্তু দুই সেকেন্ডের বেশি ধরে রাখতে পারেননি। তিনি কীভাবে ভেসে উঠেছেন, তা মনে নেই।

নিমেষেই চোখের সামনে স্ত্রী-সন্তানকে পানিতে তলিয়ে যেতে দেখেন আবদুল আজিজ। তিনি গতকাল সারা রাত দৌলতদিয়ায় পদ্মার পাড়েই ছিলেন। রাত ১২টার দিকে জানতে পারেন, স্ত্রীর লাশ পাওয়া গেছে। পরে হাসপাতালে গিয়ে লাশ শনাক্ত করেন। আজ ভোরে এক পুলিশ সদস্য জানান, গেঞ্জি পরা, হাতে ঘড়ি—এমন একটি শিশুর লাশ পাওয়া গেছে। সেখানে গিয়ে ছেলের লাশ পান। স্ত্রী-সন্তানের লাশ নিয়ে সকালে বাড়িতে ফেরেন আবদুল আজিজ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top